রোজায় রান্নার যুদ্ধঃ চুলার সিরিয়াল নিয়ে শ্রমিকদের দুর্ভোগ
সেহরির আগে ঘুম থেকে উঠে লাইন দিতে হয়, তবুও সময়মত রান্না করা যায়না। ঘুম থেকে উঠে দেখি চুলায় ১০-১২ জনের সিরিয়াল লেগে আছে। কারো রান্না শেষ হতে দেরী হলে তো আমাদের শেষ! গ্যাসের চাপ কম থাকে, রান্না করতেও সময় লাগে বেশি। আবার কখনো গ্যাস থাকে, কখনো থাকেনা। আগের রাতে রাতে রান্না করে রাখলেও সেহরিতে খেতে গেলে গরম করার উপায় পাইনা। ইফতারের সময়ও একি অবস্থা তাই বাধ্য হয়ে দোকানের ভাজা পোড়া খাওয়া লাগে। প্রতিদিন কিনে খাওয়া কষ্টকর, দামও বেশি।
আমি নুসরাত জাহান খাদিজা।সহজ ভাবে বলতে গেলে গামের্ন্টস এ চাকুরী করি,কিন্তু খুব বলতে ইচ্ছা করে আমি এবার ইন্টার পরীক্ষার্থী।জন্মের পর থেকে জুয়ারী বাবা আর গামের্ন্টস্ এ চাকুরী করা মায়ের অভাবের সংসারে বড় হওয়া।
প্রতিনিয়ত চোখের সামনে মাকে টাকার জন্য বাবার কাছে মার খাওয়া দেখে বড় হওয়া।কখনও পড়ালেখোর কথা চিন্তাও করতাম না ।কিন্তু স্কুলে যেতে ইচ্ছা করতো ,তবে ভয়ে বলতে পারতাম না। মা যেন আমার মনকে পড়তে পেড়েছিলো।শুরু হলো আরেক যোদ্ধ।প্রতিমাসে বাবার কাছ হতে টাকা লুকিয়ে মা আমার পড়ার খরচ চালাতেন।আর মা মার খেতেন টাকা লুকানোর কারনে।
একটা সময় এসে নিজেই হাল ছেড়ে দিলাম ,পাশাপাশি পড়ার খরচ ও সংসার খরচ চালানো যাচ্ছিলো না।তাই বাধ্য হয়েই কতদিন সাব কন্ট্রাকে কাজ করলাম আর মন হলো ৮ এর জিএসসি টা দেই।ভোটার আইডি ছাড়া তো কোথাও নিবেও না।সাব-কন্ট্রাকে কাজ করে ৬ মাস কাজ করি ফাকে ফাকে পড়াশুনা করি। একটা পর্যায়ে ভালো রেজাল্ট আসে। আবার মনে হলো এসএসসি টা দেই ।খুব ইচ্ছা করে মানুষের সেবা করি। নার্সদের খুব ভালো লাগে।
সিদ্ধান্ত নিলাম যে ভাবেই হোক নার্স হবো তাই সাইন্স নিলাম।অনেক খরচ সাইন্সে। সাব -কন্ট্রাকে কাজ করে সাইন্সের খরচ চালাতে পারবো না। মা অনেক রিকোয়েস্ট করে তার কারখানাতেই জন্ম নিবন্ধন দিয়ে চাকুরী নিয়ে দিলো। বসেরাও সুযোগ দিলো,কিন্তু কপাল খারাপ….বাবাা এবার পই পই করে পে স্লিপ ধরে বেতন নিয়ে যায়।শুরু হয় মা-মেয়েকে একসাথে টাকার জন্য অত্যাচার । বহুবার বাসা ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু তার হাত থেকে রক্ষা পাই নি। এবার এসে লাগলো আমাকে আর পড়ালেখা করতে দিবে না।আমি দমে যাবার মেয়ে নই। এর মাঝেই সাইন্স হতে এসএসসি তে 4.73 পাই।
স্বপ্নেরে পথে আরেক ধাপ এগিয়ে। এখন আর পিছন ফেরা যাবে না। কারখানাতে বললে ,বলে তুমি কলজে ভর্তি হও তোমাকে সপ্তাহে ১ দিন কলেজ করার আনুমতি দেয়া হবে। কলেজে বলার পর তারাও বুঝতে পারে এবং আমাকে সুযোগ দেয়।আমি এখন আলাদা রুম নিয়ে থাকি আমার স্বপ্ন পূরনের জন্য। এবার টেষ্ট পরীক্ষা দিছি,কারখানা ছুটি দিছে তবে বেতন কাটছে।তাতেও আমি খুশি।সবাই আমার জন্য দোয় করবেন ।আমি যেন নার্স হয়ে সবার সেবা করতে পারি……..
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, বিশেষত নারী শ্রমিকরা, প্রতিদিন এই শিল্পে কাজ করে দেশের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন। তবে, এই শিল্পে নারীদের প্রতি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা একটি নীরব সংকট হয়ে দাড়িয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য,যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন ও শারীরিক সহিংসতা- এই সব কিছুই নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা।
আমি আখি, কাজ করি একটি গার্মেন্টস কারখানায়। তিন বছর ধরে এই পেশায় আছি, কিন্তু প্রতিদিনই লড়াই করতে হয়— ওভারটাইমের চাপ, বেতন বৈষম্য, আর নারীদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ সহ্য করতে হয়। প্রথম প্রথম এসে বুঝিনি, এখানে শুধু হাতের কাজ নয়, মানসিক শক্তির ও পরীক্ষা দিতে হবে। তবে আমি জানি, পরিবর্তন একদিন আসবেই, যদি আমরা একসঙ্গে দাড়াই।
এইতো আজকে দুপুরেই খাওয়ার সময়ের কথা-
রুবিঃ আপু, আজ আবার সুপারভাইজার আমাকে ওভারটাইম করতে বলল। রাজি না হওয়ায় কেমন কটূ কথা বলল! বলল, ‘’তোর চাকরি থাকলে ভালো হয়ে যা!’’
আমিঃ এসব তো প্রতিদিনের ব্যাপার রুবি। আমি তো তিন বছর ধরে দেখছি, আমাদের মেয়েদের সঙ্গে এমনই আচরণ করা হয়। আমরা যদি প্রতিবাদ করি তখনো সমস্যা, না করলেও সমস্যা।
রুবিঃ কাল এক বড় সাহেব আমাদের ফ্লোরে এসেছিলেন। কিছু মেয়েরা তাকে অভিযোগ করতে চেয়েছিল, কিন্তু সুপারভাইজার রা ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দিয়েছে।
আমিঃ আর বলো না! গত মাসে রিনা প্রতিবাদ করেছিল, তারপর কি হলো? তার কাজের জায়গা বদলে দিলো, এমন একটা ফ্লোরে পাঠালো যেখানে কাজের চাপ বেশি, কিন্তু মজুরি কম। শেষে সে নিজেই চাকরি ছেড়ে দিলো।
রুবিঃ তাহলে আমরা কি করবো আপু? সব সময় ভয় নিয়েই চলতে হবে?
আমিঃ ভয় পেলেতো ওরা আরো সুযোগ নেবে। আমাদের সবাই মিলে একসাথে দাড়াতে হবে। যদি আমরা একা একা কিছু বলি, কাজ হবে না। কিন্তু একসঙ্গে প্রতিবাদ করলে মালিকপক্ষ ভাববে।
রুবিঃ হুম… তাহলে একটা শ্রমিক ইউনিয়ন থাকা দরকার, তাই না?
আমিঃ একদম ঠিক বলেছো! নারীদের জন্য আলাদা অভিযোগ কেন্দ্র আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো। কিন্তু এসব দাবি আদায় করতে হলে আমাদেরও সচেতন হতে হবে।
রুবিঃ ঠিক বলেছো আপু। এখন থেকে আমরা সবাই মিলে নিজেদের অধিকারের জন্য আওয়াজ তুলব। একা ভয় পেলে কিছুই হবেনা।
আমাদের মতো শ্রমিকরা যদি একত্র না হই, তাহলে কেউ আমাদের কথা শুনবে না। আমি চাই, সব নারী শ্রমিক যেন তাদের অধিকারের জন্য আওয়াজ তুলতে পারে, যেন কেউ আর ভয় না পায়। আমাদের লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়, পরবর্তি প্রজন্মের জন্যও।