”শ্রমিক বান্ধব ব্লগ”

Bangladesh Center for Workers’ Solidarity

Category: অন্যান্য

শীত, সংগ্রাম, ও স্বপ্নের গল্পঃ গার্মেন্টস কর্মী্দের অদম্য জীবনযুদ্ধ

শীত আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে কিন্তু শীতকালে গার্মেন্টস কর্মীদের জীবনে মিশে থাকে কাজের চাপ,পরিবারের উষ্ণতা, আর ছোট ছোট আনন্দ-বেদনার গল্প।

ভোর ৫টা। ঘরের কোণে থাকা ছোট চুলায় হাত রেখে একটু উষ্ণতা নিলাম। পাশেই মেয়ে রাইমা ঘুমন্ত অবস্থায় মুরি দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। এত ঠান্ডায় উঠা যে কত কষ্টের তা কেউ জানেনা। শীতকালে আমাদের মত গার্মেন্টস কর্মীদের কাজের চাপ কমে না বরং ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভোরে উঠে কাজ  শুরু করা সবার জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ। কর্মস্থলে অনেক সময় পর্যাপ্ত গরম পোশাকের অভাব থাকে যা কাজের গতি ও স্বস্তিকে প্রভাবিত করে তবুও আমরা আমাদের সাধ্যমত কাজ চালিয়ে যাই, কারন এই আয়ের উপরই নির্ভর করে আমাদের পরিবারের জীবনযাত্রা।

আজ অনেক শীত পড়েছে।

পাশে থেকেই রুনা বলছে, আরে আঁখি, আজ তো মনে হচ্ছে ঠান্ডায় হাত-পা জমে বরফ হয়ে যাবে। আমি বলি, হুম, ঠান্ডা তো জমাট বেঁধে রেখেছে।

কিন্তু সেলাই মেশিন তো থামবে না! মেশিন কি শীত বোঝে? তখনি রুনা বলে, চা আনবি? তাহলে তো দুনিয়ার ঠান্ডা মাফ!দেরি করিস না চা আন।

গার্মেন্টসের ফ্লোরে কাজের ফাঁকে এই সামান্য মজার মুহুর্ত গুলোই যেন শীতের কষ্ট ভুলিয়ে রাখে। এই কথোপকথনের মাঝেই আমরা কাজ চালিয়ে যাই কারন লক্ষ্য থাকে সময়মত কাজ শেষ করার নয়তো সামান্য দেরি মানেই বকুনি।

এই শীতের সন্ধ্যায় আমি আমার দুই সন্তানকে নিয়ে ঘরে পুরোনো একটি কম্বল দিয়ে তিনজন একসাথে জড়িয়ে বসেছিলাম তখন ছেলে বলে মা এই কম্বলটা এত ছোট কেন?আমি টানছি তো তোর পা বের হয়ে যাচ্ছে। আমি বলি, কম্বল ছোট হয়ে গেসে না তুই বড় হয়ে গেছিস? আমার ছেলে বলে, তাহলে তুমি আমাদের জন্য নতুন কম্বল কেনো না, মা?

এই হাসি তামাশার মাঝেও আমি ভাবনার সাগরে ডুবে যাই কারন আমিতো জানি নতুন কম্বল কেনার ইচ্ছা থাকলেও আমার সামর্থ হয়ত সবসময় সেই অনুমতি দেয়না।

এই শীতের দিনে গ্রামের কিছু অতীতের স্মৃতিও মনে পড়ে যায় যার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি টা হলো খেজুরের রস খাওয়া। ভোরবেলায় ঠান্ডা কুয়াশার মাঝে কাথা মুড়ি দিয়ে উঠেই আমি ছুটতাম খেজুর গাছের নিচে।মাটির হাড়ি থেকে টাটকা রস খেয়ে যে তৃপ্তিটা পেতাম তা কোনো দামি খাবারেও নেই। মায়ের হাতের পিঠা ছোট ভাইবোনদের সাথে বসে খাওয়ার সময়টা আমার কাছে পৃথিবীর সেরা মুহুর্ত।

আমাদের জন্য শীত মানে কাজের চাপ, পরিবারকে ভালো রাখা, আর কিছু স্বপ্ন।

Updated: December 30, 2024 — 1:20 pm

শীতের শিরশিরে কাঁপছে হাত, পা জমাট বেঁধে যাচ্ছে, সংসার ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম

প্রতিদিন সকালে আমি একই কড়া শীতে জেগে উঠি, ঘুম থেকে উঠেই শরীর কাঁপতে থাকে। পাতলা শীতের জামাটা কোন কাজে দিচ্ছেনা। ঠান্ডা বাতাস শরীরে ভেদ করে ঢুকে পড়ে। ছোট্ট ঘরেই যেন শীতের আঁচল জড়িয়ে ধরেছে। বাড়িতেও শান্তি নেই, স্বামী একার, ঋণের চাপে চাপা পড়ে আছি। স্বামী গত কয়েকদিন ধরে বাইরে, খবর নেই। মেয়েটি জ্বরে আক্রান্ত, ওষুধ কিনতে টাকা নেই। কারখানার কথা ভাবলেই শরীরে কাঁটা আসে। ওখানেও ঠান্ডা যেন জমে আছে।
কারখানার মেঝে যেন বরফের চাদর। হাত পা ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে গেছে। সিলিং মেশিন চালানই যেন যুদ্ধ।মাথায় ঘুরছে বাড়ির ভাড়া, ছেলের স্কুল ফি, ওষুধের খরচ, স্বামী কোথায় গেল, কি হল তার? চোখে শুধু পানি জমা হচ্ছে।
সুপারভাইজার চিৎকার করেই যাচ্ছে , জোরে কাজ করো, জোরে! তাঁর কিছুই যেন আসে যায় না আমাদের ঠান্ডায় কাঁপা, দাঁত করকরানিতে। তিনি শুধু দেখেন পাহাড়ের মতো জমাট পড়ে থাকা কাপড়ের গাদা। ব্যাথা, অস্বস্তি সব কিছুকেই উপেক্ষা করার চেষ্টা করি, কিন্তু সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। সহ্য করতেই হবে আর কি করব? পাশের বেঞ্চে বসা রুমা বলে, আমারও তো একই অবস্থা, স্বামী বলেছে আজকে বেতন দিতে পারবেনা, বাচ্চার জ্বর কমছেই না। বাড়িতে ফিরলেই ছেলের কান্না শুনতে পাব, স্বামী ফিরে আসবে কিনা জানিনা, সংসার ভেঙ্গে পড়ার ভয় আমাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
দুপুরের খাবারের সময় সবাই একসাথে জড়ো হই, গল্প করি আমাদের কাঁপা শরীরের, ঠান্ডায় লেগে যাওয়া রোগের, সংসারের জটিলতা। কি করবো আমরা? এই শীত আর এই দুঃখ কবে শেষ হবে, কেউ একজন কাঁদতে কাঁদতে বলে। স্বপ্ন দেখি এমন একটা দিনের যখন গরম কাপড় কিনতে পারবো , একটু গরম ঘরে থাকতে পারবো, ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে পারবো, স্বামীকে ফিরে পাবো, সংসারে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু এই সবই তো স্বপ্ন।
কোনো কোনো দিন ঠান্ডা সহ্য করা যায়না। শরীর যন্ত্রণায় ছটফট করছে, মাথা ঘুরছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয়, ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে কি করবো, স্বামী আর ফিরে আসবেনা এই ভয় সবসময়ই সঙ্গি।বেতন কমে যাবে,বাচ্চাদের খাওয়ান দুষ্কর হয়ে পরবে, এই ভয় সবসময়ই ছায়ার মতো পিছু নেয়।
একটা দিনের জন্য আকাঙ্ক্ষা করি যখন শীত মানে আএ দুর্ভোগ হবে না। গরম কারখানায় কাজ করতে পারবো, অসুস্থ হউয়ার ভয় ছাড়াই। পরিবারের জন্য ভালো জীবন দিতে পারবো, দারিদ্র্য আর শীতের কড়াকড়ি থেকে মুক্তি পেয়ে , সংসারে আবার শান্তি ফিরে আসবে, স্বামীকে পাশে পেয়ে।

Updated: December 17, 2024 — 1:19 pm
”শ্রমিক বান্ধব ব্লগ” © 2018