মূলত রপ্তানীমুখী পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের বেতন ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চিতে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দক্ষ শ্রমিক হারিয়ে না যাওয়া, দুর্যোগ কালীন সময়ে শ্রমিকদের অনুদান দেওয়া, কেন্দ্রীয় তহবিল হতে শ্রমিক এবং তাদের পরিবারকে সহায়তা করা, শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তি দেওয়া, শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া, শ্রমিক কর্মচারী দুর্ঘটনায় পতিত হলে রক্তের ব্যবস্থা করা, শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এমপ্লয়ি ডাটাবেজ তৈরির কথা জানতে পারা যায়।

২০১৯ সালে বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারা যায় দেশে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার কর্মীর প্রায় ৫৫ লাখ এর মধ্যে ৩৮ লাখ কর্মীর একটি ডাটাবেজ তৈরির কথা। এই ডাটাবেজে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মীর নাম, জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বর (এনআইডি), ছবি, আঙুলের ছাপ, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, মোবাইলফোন নম্বর, কোন কারখানায় কী পদে চাকরি করেন, আগে কোথায় চাকরি করেছেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিশেষ দক্ষতা, রক্তের গ্রুপ, দেশের কোন এলাকা থেকে এসেছেন ইত্যাদি তথ্য। ফলে এখন যেকোন গার্মেন্টকর্মী সম্পর্কে জানতে সরাসরি তার সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন নেই। ডাটাবেজে লগইন করে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সব তথ্য পাওয়া যায়।
‘বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি অ্যান্ড ওয়ার্কার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এমপ্লয়ি ডাটাবেজ’ নামের এই সফটওয়্যারটি বর্তমানে দেশের প্রায় বিজিএমইএ অনর্ভুক্ত সকল কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি তৈরিতে সহায়তা দিয়েছে টাইগার আইটি নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
প্রকৃত ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১১ সালের আগে দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ হতো। ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলা লেগে থাকার কারণে সৃষ্টি হতো অচলাবস্থা। সে সময় এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সঙ্গে গবেষণা করে ওই বছরই এই ডাটাবেজ সফটওয়্যার তৈরি শুরু করে সিসটেক ডিজিটাল। তাদের সঙ্গে ছিল টাইগার আইটি। এই ডাটাবেজে যুক্ত হয় তৈরি পোশাককর্মীদের তথ্য। এরপর থেকে কোন পোশাক কারখানায় বিশৃঙ্খলা বা শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে, ডাটাবেজ থেকে তা সহজেই খুঁজে বের করা হয়। জড়িতদের নামের পাশে ‘পারফরমেন্স রিপোর্ট’ যুক্ত করা হয়। ফলে সহজেই তাদের চিহ্নিত করতে পারে অন্যান্য কারখানার মালিকরা। এতে ঐ শ্রমিকের কোথাও চাকরি না হবার সুবাদে এই প্রক্রিয়ায় পোশাক খাতের অযাচিত বিশৃঙ্খলা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ আনার মাধ্যমে সফলতা লাভ করে।
প্রথমে ঢাকার আশুলিয়া এলাকার পোশাক কারখানাগুলোতে এই সফটওয়্যার চালু করা হয় কারণ আশুলিয়া এলাকার কারখানাগুলো থেকেই শ্রমিক অসন্তোষের উদ্ভব শুরু হয়। ২০১৫ সালের পর থেকে সফটওয়্যারের ব্যবহার সারাদেশের কারখানাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, শুধু যেসব কারখানা তৈরি পোশাক সরাসরি রফতানি করে, তাদের জন্য এই সফটওয়্যারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সফটওয়্যারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বিজিএমইএ।
বিকেএমইএ’র অন্তর্ভুক্ত কারখানাগুলোতে ব্যবহৃত ডাটাবেজ সফটওয়্যারে বায়োমেট্রিক (হাতের আঙুলের ছাপ) প্রযুক্তি না থাকায় বিজিএমইএ এর এই সফটওয়্যারেই ঝুঁকছেন কারখানার মালিকরা।
২০১৯ সালে ৩০ আগষ্ট তৎকালীন বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি আরশাদ জামাল দিপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে শ্রমিক মাইগ্রেশন (কোনও কিছু না জানিয়ে দল বেঁধে এক কারখানা থেকে শ্রমিকদের অন্য কারখানায় যোগদান করা) রোধ করতে এই ডাটাবেজ ব্যবহার করা হয়। শ্রমিক মাইগ্রেশন ঠেকানো, অসন্তোষ দূর করা, চিহ্নিত শ্রমিকদের অপকর্ম সম্পর্কে তথ্য জানা—এই সফটওয়্যার ব্যবহারের কারণে সহজ হয়। এভাবেই সফটওয়্যারটি কারখানা মালিকদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।’
ডাটাবেজ সংক্তান্ত ব্যবহারের নির্দেশনা বিজিএমইএ এর নোটিশ বক্সে দেওয়া থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে, শ্রমিকদের অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কারখানা কর্তৃপক্ষ ডাটাবেজ সিস্টেমকে অপব্যাবহার করছে। (শ্রমিককে কালো তালিকা ভুক্ত করা)
শ্রমিকদের ন্যায়ের জন্য দমিয়ে রাখা, তাদের সুযোগ সুবিধা থেকে বিরত রাখা, আইনী অধিকার ভোগ করতে না দেওয়া ইত্যাদি কারখানার স্বার্থ হাসিল করতেই ডাটাবেজ সিস্টেমের অপব্যবহার।
শ্রম আইন অধিকার দিয়েছে শ্রমিকদের কথা বলার, বাংলাদেশ সংবিধান ক্ষমতা দিয়েছে নাগরিক তার অধিকার ভোগ করার। বাংলাদেশের আইনে কোথাও নাগরিকদের কর্মসংক্রান্ত নাম ধরে তালিকা ভুক্ত করার কথা নেই, হাইকোর্টের কোন নির্দেশনায়ও এমনটি বলা নেই।
তথ্য প্রযুক্তির যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে দেশের অর্থনিতীর ২য় চালিকা শক্তিতে নিয়োজিত শ্রমিকদের দমিয়ে রাখতে তাহলে কেন এত আয়োজন?
নওশাদ রায়হান- বিসিডাব্লিউএস, কোনাবাড়ী।




Users Today : 156
Users Yesterday : 324
This Month : 7946
This Year : 40839
Total Users : 121337
Views Today : 347
Total views : 436242
Who's Online : 4