”শ্রমিক বান্ধব ব্লগ”

Bangladesh Center for Workers’ Solidarity

শীতের শিরশিরে কাঁপছে হাত, পা জমাট বেঁধে যাচ্ছে, সংসার ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম

প্রতিদিন সকালে আমি একই কড়া শীতে জেগে উঠি, ঘুম থেকে উঠেই শরীর কাঁপতে থাকে। পাতলা শীতের জামাটা কোন কাজে দিচ্ছেনা। ঠান্ডা বাতাস শরীরে ভেদ করে ঢুকে পড়ে। ছোট্ট ঘরেই যেন শীতের আঁচল জড়িয়ে ধরেছে। বাড়িতেও শান্তি নেই, স্বামী একার, ঋণের চাপে চাপা পড়ে আছি। স্বামী গত কয়েকদিন ধরে বাইরে, খবর নেই। মেয়েটি জ্বরে আক্রান্ত, ওষুধ কিনতে টাকা নেই। কারখানার কথা ভাবলেই শরীরে কাঁটা আসে। ওখানেও ঠান্ডা যেন জমে আছে।
কারখানার মেঝে যেন বরফের চাদর। হাত পা ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে গেছে। সিলিং মেশিন চালানই যেন যুদ্ধ।মাথায় ঘুরছে বাড়ির ভাড়া, ছেলের স্কুল ফি, ওষুধের খরচ, স্বামী কোথায় গেল, কি হল তার? চোখে শুধু পানি জমা হচ্ছে।
সুপারভাইজার চিৎকার করেই যাচ্ছে , জোরে কাজ করো, জোরে! তাঁর কিছুই যেন আসে যায় না আমাদের ঠান্ডায় কাঁপা, দাঁত করকরানিতে। তিনি শুধু দেখেন পাহাড়ের মতো জমাট পড়ে থাকা কাপড়ের গাদা। ব্যাথা, অস্বস্তি সব কিছুকেই উপেক্ষা করার চেষ্টা করি, কিন্তু সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। সহ্য করতেই হবে আর কি করব? পাশের বেঞ্চে বসা রুমা বলে, আমারও তো একই অবস্থা, স্বামী বলেছে আজকে বেতন দিতে পারবেনা, বাচ্চার জ্বর কমছেই না। বাড়িতে ফিরলেই ছেলের কান্না শুনতে পাব, স্বামী ফিরে আসবে কিনা জানিনা, সংসার ভেঙ্গে পড়ার ভয় আমাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
দুপুরের খাবারের সময় সবাই একসাথে জড়ো হই, গল্প করি আমাদের কাঁপা শরীরের, ঠান্ডায় লেগে যাওয়া রোগের, সংসারের জটিলতা। কি করবো আমরা? এই শীত আর এই দুঃখ কবে শেষ হবে, কেউ একজন কাঁদতে কাঁদতে বলে। স্বপ্ন দেখি এমন একটা দিনের যখন গরম কাপড় কিনতে পারবো , একটু গরম ঘরে থাকতে পারবো, ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে পারবো, স্বামীকে ফিরে পাবো, সংসারে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু এই সবই তো স্বপ্ন।
কোনো কোনো দিন ঠান্ডা সহ্য করা যায়না। শরীর যন্ত্রণায় ছটফট করছে, মাথা ঘুরছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয়, ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে কি করবো, স্বামী আর ফিরে আসবেনা এই ভয় সবসময়ই সঙ্গি।বেতন কমে যাবে,বাচ্চাদের খাওয়ান দুষ্কর হয়ে পরবে, এই ভয় সবসময়ই ছায়ার মতো পিছু নেয়।
একটা দিনের জন্য আকাঙ্ক্ষা করি যখন শীত মানে আএ দুর্ভোগ হবে না। গরম কারখানায় কাজ করতে পারবো, অসুস্থ হউয়ার ভয় ছাড়াই। পরিবারের জন্য ভালো জীবন দিতে পারবো, দারিদ্র্য আর শীতের কড়াকড়ি থেকে মুক্তি পেয়ে , সংসারে আবার শান্তি ফিরে আসবে, স্বামীকে পাশে পেয়ে।

Updated: December 17, 2024 — 1:19 pm

The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

”শ্রমিক বান্ধব ব্লগ” © 2018