গত কয়েকদিন আগের কথা হয়তো এপ্রিলের মাঝামাঝি কোন এক তীব্র গরমের দুপুর বেলা, ৪০ ছুঁই ছুঁই এক আপা উস্কো চুলে হন্ত দন্ত হয়ে এসে পড়লেন আমার সামনে।
শরীরে চাপা মারের ব্যাথা আর এক আকাশ সমান মানুষিক কষ্ট,কিছু বলার ভাষা খুজে পাচ্ছিলেন না।প্রাথমিকভাবে জানতে পারলাম নাম তার শাহনাজ।
পরিচয়ও একাধিক,প্রথমত গার্মেন্টস কর্মী, ৪ কন্যার জননী ও একজন রাজমিস্ত্রীর বউ আবার একজন শাশুড়ী । তিন কূলে আর কেও নেই।খুব অসহায় অবস্থায় নিজের অবস্থান বর্ননা করছিলেন।বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন ২ বছর বাকী ৩ টার মাঝে ২ টা মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে বাকী একজন মায়ের সাথে ডে- কেয়ারে বেড়ে ওঠছে।এখন তিনি আবার ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্বটা ওনাকেই নিতে হয়েছে।দুর্ভাগ্য বশত যে মাসে তার ইনজেকশনের তারিখ ছিলো তখন কারখানা হতে ছুটি পায় নাই।এর পরেই জানতে পারি আমি গর্ভবতী।
সমস্যাঃ যখন বাসায় সবাই জানতে পারে সাথে সাথে জোড় করে আমাকে হাসপাতালে আনা হয় গর্ভপাত করানোর জন্য কিন্তু ডাক্তার আমাকে দেখে বলেন সম্ভব না,শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে মৃত্যুঝুকি রয়েছে।আমি ফিরে আসতে চাই তারপরও আরও ৩ টা হাসপাতালে নেয়া হয় কিন্তু সবজায়গা হতে একই কথা বলে।আমি সিদ্ধান্ত নেই “আমি এই বাচ্চা জন্ম দিবো।”ঘটনার শুরু তখন হতে,আমার মেয়ের জামাই মেয়েকে বলে তোমার মা বাচ্চা জন্ম দিলে আমি তোমাকে তালাক দিবো আর আমার স্বামী বলতে থাকে বাচ্চা নষ্ট না করলে আমি তোমাকে তালাক দিবো।আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল রইলাম কারন আমি নিজেকে মৃত্যুমুখে ফেলে দিতে পারবো না,আমি জানি সন্তান হবার সময়ও আমার ঝুঁকি আছে তবুও না দেখা সন্তানের মায়ায় পড়ে গেছি।আমি আমার অন্য সন্তানদের মতো পেটের সন্তানের মায়ায় পড়ে গেছি।এভাবে মানসিক নির্যাতনের মাঝেই যাচ্ছিলাম। বড় মেয়ে সম্পর্ক রাখলো না,কয়েকদিন পড় স্বামী চলে গেলো অন্যকোথাও কোন খোঁজ পেলাম না।
অবাক করে দিয়ে ২৪ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি টানলো আমাকে ডিভোর্স দিয়ে।সাথে পাওনা হিসাবে পেলাম এই সন্তানের বাবা নাকি অন্যকেও। আমি চরিত্রহীনা।সকল অশান্তির মাঝেও আমি কারখানায় ডিউটি করছিলাম কারন আমার সাথে আরও ৩ জন বাচ্চা তাদেরকে তো দেখতে হবে।আমি যেহেতু পিসি কমিটির সদস্য তাই এ্যাডমিন ম্যানাজার ও জিএমকে আমার সমস্যার কথা জানাই।আমাকে আশ্বস্ত করে বলে তুমি ডিউটি করো তবে তুমি মাতৃত্বকালীন ছুটির টাকা পাবানা ছুটি পাবা।আমিও মনে পাথর বেধে কাজ করছিলাম কারন আমাকে কাজ করে ৩ জন বাচ্চার খাবার জোগাড় করতে হবে আবার নিজেকেও সুস্থ থাকতে হবে।পরবর্তী সময়ের জন্য কিছু টাকা জমাতে হবে।কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না আজকে আমাকে এ্যাডমিন থেকে ঢেকে চাকুরী নাই বলে দিছে। এইমাস এপ্রিল মাসের পরে আর ডিউটি করতে হবে না। কারন হিসাবে জানালেন আমি শারীরিক ভাবে দুর্বল, যে কোন সময় আমার সমস্যা হতে পারে।
এই ঘটনা আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ঘটছে।এখানে উপেক্ষিত হচ্ছে একজন নারীর তার নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকে,যৌন ও প্রজনন স্বস্থ্য বিষয়টি শুধু নারীর দায়িত্ব তা উল্লেখিত হচ্ছে এবং আমাদের দেশে প্রচলিত স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো ৯৫% নারীদের কাছে যাচ্ছেন কেন তারা সমতার ভিত্তিতে কাজ করছেন না এবং সর্বশেষ নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিকে পিষে মারার চেষ্টা করা হয়েছে।
যে সন্তান পৃথিবীর মুখই দেখতে পারলো না এখনে, ভূমিষ্ঠ হলে কি করে সইবে এই বোঝা।
পুনশ্চঃ কারখানায় কথা বলার পর বর্তমানে কারখানায় কর্মরত আছেন এবং পারিবারিক ইস্যু সমাধানে ব্লাষ্টে পাঠানো হয়েছে।





Users Today : 40
Users Yesterday : 129
This Month : 2712
This Year : 18730
Total Users : 99228
Views Today : 170
Total views : 384107
Who's Online : 1
হৃদয়স্পর্শী লেখা। এভাবেই উঠে আসুক শ্রমিকের হৃদয়দহন আর বেদনার কথা
আইনগত পরামর্শ দেওয়ার পর আপা চাকুরীতে পুনঃবহাল হয়েছেন।পুরাতন জয়েন ডেটে।