মোঃ সুজন মিয়াঁ ( পিএন কম্পোজিট পোশাক কারখানার শ্রমিক), তিনি কয়েকমাস পূর্বে কারখানায় দেখতে পান- কাটিং সেকশনে নতুন একটি যন্ত্র সংযোজন করা হয়েছে সাথে রয়েছে কম্পিউটারাইজড মনিটর। মনিটরে কয়েকটা চাপ দিতেই নতুন মেশিন হতে তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল আলো বের হয়ে মাত্র ৩০ মিনিটের ভিতরে সব কাপড় নিখুঁত ভাবে কেটে ফেলছে। তিনি আরো লক্ষ্য করেছেন এই কাটিং সেকশনে এর আগে অনেক লোক কাজ করতো কিন্তু বর্তমানে ১০ জনের বেশী শ্রমিক দেখাই যায় না।

গার্মেন্টস সেক্টরে অটোমেশন প্রযুক্তি সংযোজনের চিত্র

মোসাঃ জাহানার আক্তার (পিএন কম্পোজিট কারখানার পোশাক শ্রমিক), তিনি গতমাসে তাদের সুইং ফ্লোরে লক্ষ্য করেছেন নতুন ০৪টি আজব যন্ত্র। যন্ত্রগুলো কি সুন্দর করে ফ্লোর পরিষ্কার করছে কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই! ফ্লোর পরিষ্কারক কর্মীদেরকেও তিনি আর কারখানায় দেখতে পান না।
মোঃ সুজন মিয়াঁ এবং মোসাঃ জাহানারা আক্তার তাদের সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনে এবং কারখানায় বিভিন্ন সেকশনে গিয়ে লক্ষ্য করেছেন নতুন নতুন যন্ত্রের উপস্থিতি, যা তারা আগে কখনোই চোখে দেখে নাই।
লেখাপড়া এবং প্রযুক্তিগত ধারণা না থাকার কারণে মোঃ সুজন মিয়াঁ এবং মোসাঃ জাহানারা আক্তার কারখানার এসব ব্যাপারগুলো বুঝতেই পারছে না। আসলে এসব হচ্ছে অটোমেশন প্রযুক্তি এটাই হচ্ছে ৪র্থ শিল্প বিপ্লব।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে শুরু হয় ১ম শিল্প বিপ্লব, বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের মাধ্যমে শুরু হয় ২য় শিল্প বিপ্লব, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট আবিষ্কারের মাধ্যমে শুরু হয় ৩য় শিল্প বিপ্লব। প্রসার হয়েছে ইলেক্ট্রনিক্স আর ইনফরমেশন টেকনোলজির বিস্তার। জগতকে এনেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। ধারণা করা হয়েছিল এই ইন্টারনেটই ৪র্থ শিল্প বিপ্লবকে নেতৃত্ব দিবে এবং করেছেও তাই।
কৃষি নির্ভর গ্রামীণ অর্থনিতী ম্যানফ্যাকচারিং শিল্পে রূপান্তরীত হয়ে ১৯৭৭ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস ফ্রান্সে পোশাক রপ্তানি শুরুর মধ্যে দিয়ে কৃষি নির্ভর অর্থনিতীকে পোশাক শিল্প অর্থনিতীতে রূপান্তর করে নেওয়া বাংলাদেশে তথ্য ও প্রযুক্তির সূচনা হয়েছিল ১৯৬০ সালে পারমানবিক গবেষনার মধ্য দিয়ে। ১৯৯০ এর দশকে যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাত বাংলাদেশের জনগণকে যথেষ্ট আকর্ষনের মধ্য দিয়ে আবহমান বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপথকে রাতারাতি পরিবির্তন করে উন্নতদেশের সমান সুযোগ সুবিধাযুক্ত লোকালয়ে পরিণত হওয়া শুরু করলে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার থেকে সফটওয়্যার এবং তথ্য প্রযুক্তি পরিসেবা শিল্পের জন্য জাতীয় বাণিজ্য সংস্থা হিসেবে ‘ বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ‘ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সেই সাথে প্রতিষ্ঠিত হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮।
প্রযুক্তিগত উন্নয়নে দেশব্যাপী ২৮ টি হাইটেক পার্কের মধ্যে দিয়ে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবকে প্রাধান্য রেখে
- কানেক্টিভিটি ও আইসিটি অবকাঠামো
- মানব সম্পদ উন্নয়ন
- আইসিটি শিল্পের উন্নয়ন
- ই-গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জায়গায় তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার রয়েছে। সরকারি অফিস গুলোর চাইতে বেসরকারি অফিস/ শিল্প-প্রতিষ্ঠান/ গার্মেন্টস সেক্টর গুলোতে দিনদিন অত্যাধিক প্রযুক্তি ব্যবহার হয়ে উঠছে।
বর্তমান গার্মেন্টস সেক্টরে যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছেঃ
- প্যাটার্ন তৈরীর ক্ষেত্রে CAD প্রযুক্তির ব্যবহার
- কাটিং সেকশনে উন্নত মানের লেজার কাটিং মেশিন
- এ্যাম্ব্রয়ডারি ও প্রিন্টিং এর জন্য কম্পিউটারাইজ সফটওয়্যার সম্পন্ন মেশিন
- দ্রুতগতি সম্পন্ন সুইং মেশিন
- ফ্লোর ক্লিনিং এর জন্য অটোক্লিন মেশিন
- অর্ডার ম্যানেজমেন্ট এন্ড রিকয়ারমেন্টস প্ল্যানিং সফটওয়্যার
- সুইং প্রডাকশন প্ল্যানিং উইথ টাইম এন্ড এ্যাকশন সফটওয়্যার
- প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার
- ফেব্রিক কাস্ট কন্ট্রোল সফটওয়্যার
- প্রডাকশন কন্ট্রোল সফটওয়্যার
- ফিন্যানসিয়াল এ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার
- ফিক্সড এ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ও হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার
এগোলই হচ্ছে কারখানার অটোমেশন মানে কারখানার সবগুলো মেশিন এমন একটি সিস্টেমের সাথে যুক্ত হবে যেটি স্বয়ংক্রিয় চালনা থেকে শুরু করে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রন ও তত্বাবধান করবে এবং একেই বলা হচ্ছে অটোমেশন বা ৪র্থ শিল্প বিপ্লব। এতে বাঁচবে শ্রম উৎপাদন খরচ, কমবে মানবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি, বাড়বে উৎপাদন, ঠিক থাকবে পণ্যের গুনগত মান।
৪র্থ শিল্প বিপ্লবটি মূলত ডিজিটাল বিপ্লব, যেখানে কারখানাগুলো ব্যাপক হারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করবে থাকবে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। শ্রমিকেরাও আপনাআপনি প্রযুক্তির সংস্পর্শে চলে আসবে এবং সেই সাথে দেখা দিবে নিম্ন লিখিত নতুন চ্যালেঞ্জঃ
- তথ্য সুরক্ষরা অনিশ্চয়তা
- প্রযুক্তিগত সমস্যা
- ব্যক্তির গোপনীয়তা অরক্ষিত
- প্রযুক্তির কারণে শ্রমিকেরা চাকুরী হারানো ( বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনীহা)
- ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে অব্যাহত সংযোগের অভাব
- প্রযুক্তি বিষয়ে আসক্তি হয়ে যাওয়া
- স্বাস্থ্য এবং চোখের ক্ষতি সাধন
- প্রযুক্তিগত প্রতারণা
- প্রযুক্তিগত ক্রাইম বৃদ্ধি পাওয়া
- অলস হয়ে যাওয়া
- কম্পিউটারাইজড ভাইরাস এ্যাটাক
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে পোশাক শিল্পে নিয়োজিত বিশাল এ জনসম্পদ কিংবা স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকেরা কি করবে?- সময় এখন আধুনিক প্রযুক্তি রপ্ত করার, আধুনিক প্রযুক্তির সাথে শ্রমিকদের পরিচিত করার, হাতে কলমে তাদের শিক্ষাদান, প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ানো এবং ভিতী দূর করা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন শ্রমিকদের নিকট তুলে ধরা। কেবল মাত্র প্রযুক্তিতে দক্ষতাই ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে পিছিয়ে পড়া শ্রমিকদের এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিবে।
সর্বপরি, বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনগুলোকে পিছিয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত মঞ্চ প্রস্তুতের দায়িত্ব নিতে হবে।
নওশাদ রায়হান
বিসিডব্লিউএস- কোনাবাড়ী





Users Today : 911
Users Yesterday : 142
This Month : 3841
This Year : 19859
Total Users : 100357
Views Today : 1302
Total views : 385953
Who's Online : 2
আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখতে শ্রমিকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নাই।
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে শ্রমিক ভাই ও বোনদের অগ্রগতি বাড়াতে হবে। তাহলে যুগের সাথে তাল মিলাবো সম্ভব হবে।
পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান সময়ের সাথে টিকে থাকতে হলে, তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সচেতন করতে হবে ।
চতুর্থ বিপ্লব সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানাতে হবে ।