আখি একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। নারায়নগঞ্জ শহরের এক ঘিঞ্জি বস্তিতে ছোট্ট একটা ঘরে থাকে সে—স্বামী, ছেলে-মেয়ে আর এক টুকরো স্বপ্ন নিয়ে।
ঘরটা টিনের ছাউনি দেওয়া। এই রোদের দিনে মনে হয় যেন আগুন ঝরে মাথার ওপর! কাঁথা-বালিশ গরমে হাঁসফাঁস করে, ঘুম হয় না রাতেও।
ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। এই গরমে ঘরের কাজ সেরে আখি রওনা হয় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির দিকে। পলিথিন-আবর্জনায় ভর্তি রাস্তা পেরিয়ে হাঁটে সে। বৃষ্টি হলে রাস্তা ডুবে যায় হাঁটু পানি, আর এখনো শুকায়নি আগের দিনের পানি। জুতা খুলে হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়, ড্রেনের গন্ধে নাকে রুমাল চেপে ধরে।
ফ্যাক্টরিতে ঢুকেই নতুন যুদ্ধ। সেলাই মেশিনের আওয়াজ, গরম বাতাস, আর ঘামজল মিশে এক দমবন্ধ পরিবেশ। ফ্যান ঘোরে ঠিকই, কিন্তু মনে হয় যেন গরম বাতাস ছুড়ে দেয়।
আখি বলে, মনে হয়, গায়ে আগুন লেগে গেছে! মাথা ধরে থাকে। কেউ পানি দিতে বলে না, নিজেই টানতে হয় কষ্ট করে। এই গরমে শুধু আখিই নয়, তার সহকর্মীরাও হাঁপিয়ে উঠেছে।
“গত পরশু সেলিনা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল ফ্লোরে। তার আগের দিন নাসিমা।”
এমন দৃশ্য এখন প্রায় রোজকার। ঠাণ্ডা পানি বা বিশ্রামের সুযোগ নেই। ওষুধ বা চিকিৎসার ব্যবস্থা তেমন কিছুই থাকে না—একটু পানি ছিটিয়ে দিলে ওটাই নাকি ‘চেষ্টা’!
খাওয়া শেষে একটু চোখ বন্ধ করে বসে থাকার সময়টুকুও নেই। স্যাম্পল মাস্টার আবার ডাক দেয়, “আখি শার্টগুলো কাল শেষ করতে হবে!”
বাসায় আরামে ফেরা যেন যুদ্ধ:
ফ্যাক্টরি শেষে বাসায় ফিরতে গেলে জলাবদ্ধ রাস্তায় হাঁটতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে ঘরের সামনেই পানি জমে থাকে দিন দুই-তিন। রান্নাঘরেও পানি উঠে যায়, গ্যাস আসে না, চুলা জ্বলে না। তখন রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বাচ্চারা কাদামাটি আর পানি পেরিয়ে ঘরে ঢোকে, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মশার উপদ্রব বাড়ে, এবং পায়খানা-নালার গন্ধে টেকা যায় না।
আখির স্বপ্ন বড় নয়। শুধু চায়,
– ফ্যাক্টরিতে একটু ঠাণ্ডা হাওয়া, বিশুদ্ধ পানি।
– বাসায় এসে যেন কাদায় ভিজে না ফিরতে হয়।
– ছেলে-মেয়েরা সুস্থ পরিবেশে বড় হোক।
কেউ তার কথা শোনে না। অথচ প্রতিদিন সে এই গরমে, কাদায়, ক্লান্তিতে টিকে থাকে—জীবনের প্রয়োজনে, বাঁচার আশায়।






Users Today : 31
Users Yesterday : 146
This Month : 2777
This Year : 51507
Total Users : 132005
Views Today : 115
Total views : 475784
Who's Online : 5