”শ্রমিক বান্ধব ব্লগ”

Bangladesh Center for Workers’ Solidarity

Day: June 20, 2025

জলাবদ্ধ জীবনের গ্লানি: একজন গার্মেন্টস কর্মীর চোখ দিয়ে দেখা বাংলাদেশ….

প্রতিদিন সকাল মানেই এক যুদ্ধের শুরু

সকাল ৫:৩০। ঘড়ির অ্যালার্ম নয়, পাশের নালার পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঘুম ভাঙে। কারণ রাতে ভারি বৃষ্টিতে পুরো গলিটা ডুবে গেছে। টিনশেড ঘরের নিচে পানি ঢুকে গেছে, টিন চুয়ে পানিতে বিছানা ভেজা, চুলা পানিতে ডুবা। তবু শারমিন (ছদ্মনাম), ২৮ বছর বয়সী গার্মেন্টস কর্মী, থেমে থাকেন না। তার হাতে সময় নেই – সকাল ৮টার মধ্যে কারখানায় পৌঁছাতে না পারলে হাজিরা কাটা যাবে।

১২,৫০০ টাকার বেতন আর ৩ ভাগে ভাগ করা জীবন

একটি গার্মেন্টস কর্মীর জীবন যেন সবসময় হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে –

  • ভাড়া: ৩,৫০০ টাকা
  • বাচ্চার খরচ ও পড়াশোনা: ২,০০০ টাকা
  • মায়ের ওষুধ: ১,৫০০ টাকা
    বাকি থাকে সামান্য – খাবার, কাপড়, চিকিৎসা, জরুরি প্রয়োজন – যা প্রায়ই কল্পনারও বাইরে চলে যায়।

তবু, এই জীবন বাঁচিয়ে রাখতে তাকে প্রতিদিন ভেজা গলি পেরিয়ে কারখানার মেশিনের শব্দে নিজেকে সঁপে দিতে হয়।

জলাবদ্ধতা মানে শুধু কষ্ট নয়, মৃত্যুঝুঁকিও

জলাবদ্ধ এলাকা মানে:

  • মশার উপদ্রব বেড়ে যায়, ফলে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া
  • বাচ্চাদের পায়ের চর্মরোগ, জ্বর
  • পানিতে থাকা জীবাণুর কারণে পেটের অসুখ
  • রান্না ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় নিরাপদ খাদ্য পাওয়া কঠিন

আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এই এলাকাগুলোতে স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। খোলা ড্রেন, প্লাস্টিক বর্জ্য, টয়লেটের গন্ধ – এ যেন প্রতিদিন বিষ গ্রহণের মতো।

কারণ ও সমাধানের পথ কোথায়?

কারণসমূহ:

  1. অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বস্তি সম্প্রসারণ
  2. স্থায়ী ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাব
  3. সরকারি ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের নজরদারির ঘাটতি
  4. বাড়িওয়ালাদের অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতা
  5. শ্রমিকদের নিজস্ব সংগঠনের সীমিত আওয়াজ

সমাধান হতে পারে:

  • শ্রমিক বসতি এলাকায় টেকসই ড্রেন ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার স্থাপন
  • বাড়িওয়ালাদের নীতিগত বাধ্যবাধকতা
  • স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত পরিদর্শন
  • এনজিও বা সিভিল সোসাইটির উদ্যোগে শ্রমিক পরিবারে সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদান
  • মিডিয়ার মাধ্যমে গার্মেন্টস কর্মীদের বসবাসের বাস্তবতা তুলে ধরা

আমরা কি পারি না একটু সহানুভূতিশীল হতে?

এই নারীরা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। অথচ এই খাতের কর্মীরা নিজ ঘরের চারপাশে পানির দাপট থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেন না।

আমরা যদি প্রতিদিন তাদের বানানো জামা পরে ঘুরে বেড়াই, তবে কি একবারও ভাবি – যিনি এই জামাটি সেলাই করলেন, তার নিজের সন্তানের পায়ে আজও চর্মরোগ?

জলাবদ্ধতা এখানে শুধু একটি সমস্যা নয়, এটি এক মানবিক বিপর্যয়। একজন শ্রমজীবী নারীর চোখ দিয়ে আমরা যদি এই দৃশ্য দেখি, তাহলে বুঝব—তার যুদ্ধটা কেবল দারিদ্র্যের সঙ্গে নয়, বরং আমাদের সমাজের অবহেলা ও নীরবতার সঙ্গেও।

বাংলাদেশ সেন্টার রে ওয়ার্কার্স সলিডারিটি

গাজীপুর সেন্টার

Updated: June 20, 2025 — 11:29 am
”শ্রমিক বান্ধব ব্লগ” © 2018