বৃষ্টিতে ঘরের মধ্যে পানি ওঠে,বাসার সামনে পানি,বাচ্চাদের নিয়ে ঝুকি,সব কিছু মিলে কারখানায় ,কর্মস্থলে ,বাসায় ,রাস্তায়,সপ্তাহে কখনো একদিন বন্ধ পায়,আবার কখনো বন্ধ পায় না, ছুটি পেলে বাসার কাজ ,বৃষ্টিতে ভেজা সব কিছু শুকানো,রোধ না থাকা সব মিলে চলছে জীবন সংগ্রাম।
Month: June 2025
জলাবদ্ধ জীবনের গ্লানি: একজন গার্মেন্টস কর্মীর চোখ দিয়ে দেখা বাংলাদেশ….
প্রতিদিন সকাল মানেই এক যুদ্ধের শুরু
সকাল ৫:৩০। ঘড়ির অ্যালার্ম নয়, পাশের নালার পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঘুম ভাঙে। কারণ রাতে ভারি বৃষ্টিতে পুরো গলিটা ডুবে গেছে। টিনশেড ঘরের নিচে পানি ঢুকে গেছে, টিন চুয়ে পানিতে বিছানা ভেজা, চুলা পানিতে ডুবা। তবু শারমিন (ছদ্মনাম), ২৮ বছর বয়সী গার্মেন্টস কর্মী, থেমে থাকেন না। তার হাতে সময় নেই – সকাল ৮টার মধ্যে কারখানায় পৌঁছাতে না পারলে হাজিরা কাটা যাবে।
১২,৫০০ টাকার বেতন আর ৩ ভাগে ভাগ করা জীবন
একটি গার্মেন্টস কর্মীর জীবন যেন সবসময় হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে –
- ভাড়া: ৩,৫০০ টাকা
- বাচ্চার খরচ ও পড়াশোনা: ২,০০০ টাকা
- মায়ের ওষুধ: ১,৫০০ টাকা
বাকি থাকে সামান্য – খাবার, কাপড়, চিকিৎসা, জরুরি প্রয়োজন – যা প্রায়ই কল্পনারও বাইরে চলে যায়।
তবু, এই জীবন বাঁচিয়ে রাখতে তাকে প্রতিদিন ভেজা গলি পেরিয়ে কারখানার মেশিনের শব্দে নিজেকে সঁপে দিতে হয়।
জলাবদ্ধতা মানে শুধু কষ্ট নয়, মৃত্যুঝুঁকিও
জলাবদ্ধ এলাকা মানে:
- মশার উপদ্রব বেড়ে যায়, ফলে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া
- বাচ্চাদের পায়ের চর্মরোগ, জ্বর
- পানিতে থাকা জীবাণুর কারণে পেটের অসুখ
- রান্না ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় নিরাপদ খাদ্য পাওয়া কঠিন
আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এই এলাকাগুলোতে স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। খোলা ড্রেন, প্লাস্টিক বর্জ্য, টয়লেটের গন্ধ – এ যেন প্রতিদিন বিষ গ্রহণের মতো।
কারণ ও সমাধানের পথ কোথায়?
কারণসমূহ:
- অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বস্তি সম্প্রসারণ
- স্থায়ী ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাব
- সরকারি ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের নজরদারির ঘাটতি
- বাড়িওয়ালাদের অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতা
- শ্রমিকদের নিজস্ব সংগঠনের সীমিত আওয়াজ
সমাধান হতে পারে:
- শ্রমিক বসতি এলাকায় টেকসই ড্রেন ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার স্থাপন
- বাড়িওয়ালাদের নীতিগত বাধ্যবাধকতা
- স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত পরিদর্শন
- এনজিও বা সিভিল সোসাইটির উদ্যোগে শ্রমিক পরিবারে সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদান
- মিডিয়ার মাধ্যমে গার্মেন্টস কর্মীদের বসবাসের বাস্তবতা তুলে ধরা
আমরা কি পারি না একটু সহানুভূতিশীল হতে?
এই নারীরা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। অথচ এই খাতের কর্মীরা নিজ ঘরের চারপাশে পানির দাপট থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেন না।
আমরা যদি প্রতিদিন তাদের বানানো জামা পরে ঘুরে বেড়াই, তবে কি একবারও ভাবি – যিনি এই জামাটি সেলাই করলেন, তার নিজের সন্তানের পায়ে আজও চর্মরোগ?
জলাবদ্ধতা এখানে শুধু একটি সমস্যা নয়, এটি এক মানবিক বিপর্যয়। একজন শ্রমজীবী নারীর চোখ দিয়ে আমরা যদি এই দৃশ্য দেখি, তাহলে বুঝব—তার যুদ্ধটা কেবল দারিদ্র্যের সঙ্গে নয়, বরং আমাদের সমাজের অবহেলা ও নীরবতার সঙ্গেও।
বাংলাদেশ সেন্টার রে ওয়ার্কার্স সলিডারিটি
গাজীপুর সেন্টার



ঘামে শুরু, কাদায় শেষ। অথচ জীবন থামে না
আখি একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। নারায়নগঞ্জ শহরের এক ঘিঞ্জি বস্তিতে ছোট্ট একটা ঘরে থাকে সে—স্বামী, ছেলে-মেয়ে আর এক টুকরো স্বপ্ন নিয়ে।
ঘরটা টিনের ছাউনি দেওয়া। এই রোদের দিনে মনে হয় যেন আগুন ঝরে মাথার ওপর! কাঁথা-বালিশ গরমে হাঁসফাঁস করে, ঘুম হয় না রাতেও।
ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। এই গরমে ঘরের কাজ সেরে আখি রওনা হয় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির দিকে। পলিথিন-আবর্জনায় ভর্তি রাস্তা পেরিয়ে হাঁটে সে। বৃষ্টি হলে রাস্তা ডুবে যায় হাঁটু পানি, আর এখনো শুকায়নি আগের দিনের পানি। জুতা খুলে হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়, ড্রেনের গন্ধে নাকে রুমাল চেপে ধরে।
ফ্যাক্টরিতে ঢুকেই নতুন যুদ্ধ। সেলাই মেশিনের আওয়াজ, গরম বাতাস, আর ঘামজল মিশে এক দমবন্ধ পরিবেশ। ফ্যান ঘোরে ঠিকই, কিন্তু মনে হয় যেন গরম বাতাস ছুড়ে দেয়।
আখি বলে, মনে হয়, গায়ে আগুন লেগে গেছে! মাথা ধরে থাকে। কেউ পানি দিতে বলে না, নিজেই টানতে হয় কষ্ট করে। এই গরমে শুধু আখিই নয়, তার সহকর্মীরাও হাঁপিয়ে উঠেছে।
“গত পরশু সেলিনা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল ফ্লোরে। তার আগের দিন নাসিমা।”
এমন দৃশ্য এখন প্রায় রোজকার। ঠাণ্ডা পানি বা বিশ্রামের সুযোগ নেই। ওষুধ বা চিকিৎসার ব্যবস্থা তেমন কিছুই থাকে না—একটু পানি ছিটিয়ে দিলে ওটাই নাকি ‘চেষ্টা’!
খাওয়া শেষে একটু চোখ বন্ধ করে বসে থাকার সময়টুকুও নেই। স্যাম্পল মাস্টার আবার ডাক দেয়, “আখি শার্টগুলো কাল শেষ করতে হবে!”
বাসায় আরামে ফেরা যেন যুদ্ধ:
ফ্যাক্টরি শেষে বাসায় ফিরতে গেলে জলাবদ্ধ রাস্তায় হাঁটতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে ঘরের সামনেই পানি জমে থাকে দিন দুই-তিন। রান্নাঘরেও পানি উঠে যায়, গ্যাস আসে না, চুলা জ্বলে না। তখন রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বাচ্চারা কাদামাটি আর পানি পেরিয়ে ঘরে ঢোকে, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মশার উপদ্রব বাড়ে, এবং পায়খানা-নালার গন্ধে টেকা যায় না।
আখির স্বপ্ন বড় নয়। শুধু চায়,
– ফ্যাক্টরিতে একটু ঠাণ্ডা হাওয়া, বিশুদ্ধ পানি।
– বাসায় এসে যেন কাদায় ভিজে না ফিরতে হয়।
– ছেলে-মেয়েরা সুস্থ পরিবেশে বড় হোক।
কেউ তার কথা শোনে না। অথচ প্রতিদিন সে এই গরমে, কাদায়, ক্লান্তিতে টিকে থাকে—জীবনের প্রয়োজনে, বাঁচার আশায়।








Users Today : 31
Users Yesterday : 146
This Month : 2777
This Year : 51507
Total Users : 132005
Views Today : 117
Total views : 475786
Who's Online : 4